মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কসংক্রান্ত ঘোষণায় প্রায় প্রতিদিনই নতুন দেশ বা খাত যুক্ত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাণিজ্যিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রেখেছে এটি। তবে চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও এশিয়ার শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক প্রবণতা বজায় রেখেছে। গতকাল এ অঞ্চলের বেশির ভাগ সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কারণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি আলোচনার কৌশল হিসেবেই দেখছেন। খবর এপি।
সর্বশেষ এক সপ্তাহে শুল্কসংক্রান্ত বড় কিছু ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশ, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মোট ২৩টি দেশের ওপর ২০-৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন তিনি। এরপর কয়েক দিন বিরতি দিয়ে মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাদ পড়েনি ডজন ডজন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধরত দেশটির পণ্যে শতভাগ শুল্ক আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদন অনুসারে, গতকাল লেনদেন বন্ধ হওয়ার সময় জাপানের বেঞ্চমার্ক নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দশমিক ৪ শতাংশ ও হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক বেড়েছে দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক গতকাল দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এদিন দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হওয়ায় গত প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় কম।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে ৫ দশমিক ২ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে, যেখানে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রান্তিক ভিত্তিতে দেশটির জিডিপি বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এশিয়ার রফতানিকারকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে। এমন আশঙ্কার মাঝেও কেউ কেউ বলছেন, শুল্ক আরোপ থেকে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে পারেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। আগামী ১ আগস্ট থেকে এসব শুল্ক কার্যকর হবে, অর্থাৎ আলোচনার জন্য এখনো সময় রয়েছে।
এদিকে ওয়াল স্ট্রিটে গত সোমবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ১ শতাংশ, ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দশমিক ২ শতাংশ ও নাসডাক কম্পোজিট দশমিক ৩ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি নিয়ে লেনদেন শেষ করেছে।
২০ জুলাই জাপানি পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে দেশটির বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অপেক্ষার মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসাবান্ধব হিসেবে পরিচিত ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে টিকে থাকতে হলেও জোটসঙ্গী, এমনকি নতুন মিত্রদের দ্বারস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। ক্ষমতাসীনতা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তবে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতি নির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ১ আগস্ট প্রস্তাবিত সব শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এতে শুধু মার্কিন ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং বড় ধরনের কর ছাড় দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ আরো বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে আর্থিক বাজারে।
ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের গ্লোবাল ইকুইটিজ বিভাগের প্রধান উলরিকে হফম্যান-বুরচার্ডি বলেন, ‘ধারণা করছি, শুল্ক আরোপের সর্বশেষ পদক্ষেপগুলো মূলত আলোচনা চালিয়ে যেতে চাপ তৈরির কৌশল। সবশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক কমিয়ে আনবেন, বিশেষ করে বন্ড ও শেয়ারবাজারে নতুন অস্থিরতা শুরু হলে তিনি এটি করবেন।’
অ্যানেক্স ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান জ্যাকবসেন বলেন, ‘প্রস্তাবে এমন অনেক শর্ত ও ধারা রয়েছে যা শুল্কহার কমিয়ে দিতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা অপছন্দ করলেও বাজার এতে আতঙ্কিত হচ্ছে না।’
তবে শুল্কবিবাদ ছাড়াও পুঁজিবাজারের সামনে আরো কিছু আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি চলতি সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন মার্কিন মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গত মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা মে মাসে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানি দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ হতে শুরু করেছে। গতকাল জেপি মরগান চেজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আজ জনসন অ্যান্ড জনসন এবং আগামীকাল পেপসিকো তাদের আর্থিক বিবরণ জানাবে।
শিল্প ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী কোম্পানি ফাস্টেনাল গত সোমবার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফার খবর দিয়েছে। এতে কোম্পানির শেয়ারদর ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে কোম্পানিটি সতর্ক করে জানিয়েছে, বাজার পরিস্থিতি এখনো মন্থর।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে আর্থিক বাজারে সবচেয়ে বড় ওঠানামা দেখা গেছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল্যে। এ খাতের বৃহত্তম মুদ্রা বিটকয়েন নতুন রেকর্ড গড়ছে। শিগগিরই ১ হাজার ২৫ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে এ ডিজিটাল মুদ্রার মূল্য। গত রোববার ওয়াশিংটনে শুরু হয়েছে ‘ক্রিপ্টো উইক’। যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী’ বানানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এখন কয়েকটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার সামান্য বেড়ে গতকাল ১৪৭ দশমিক ৭৩ জাপানি ইয়েনে পৌঁছেছে, যা সোমবার ছিল ১৪৭ দশমিক ৭২ ইয়েন। ইউরোর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৬৭৭ ডলার, যা আগে ছিল ১ দশমিক ১৬৬৬ ডলার।